বাংলাদেশের আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। নির্মাণ, সিমেন্ট, রড, সিরামিক, বৈদ্যুতিক পণ্য, আসবাবপত্র, ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহনসহ দুই শতাধিক শিল্প ও সেবা খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণের ফলে গত দুই দশকে আবাসন খাত উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ নির্মাণ ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে খাতটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এমন একটি সময়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে যৌথ উন্নয়ন চুক্তির (Joint Development Agreement) আওতায় জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সুবিধার ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব আবাসন খাতে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অধিকাংশ আবাসিক প্রকল্প জমির মালিক ও ডেভেলপারের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। ফলে নতুন এই কর কেবল জমির মালিকদের নয়, বরং পুরো আবাসন খাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে আবাসন উন্নয়নের সবচেয়ে প্রচলিত মডেল হলো জমির মালিক ও ডেভেলপারের যৌথ উন্নয়ন চুক্তি। এই ব্যবস্থায় জমির মালিক তার জমি প্রদান করেন এবং ডেভেলপার নির্মাণ, নকশা, অনুমোদন, বিপণন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রকল্প শেষে উভয় পক্ষ পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ফ্ল্যাট বা বিক্রয়যোগ্য ইউনিট ভাগ করে নেন। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরগুলোর অধিকাংশ আবাসিক ভবন এই মডেলেই নির্মিত হয়েছে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে যে ফ্ল্যাট বা অন্যান্য সুবিধা পাবেন, তার মূল্য সরকারি নির্ধারিত মূল্য বা মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। এরপর জমির মূল ক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অংশকে মূলধনী লাভ (Capital Gain) হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেই লাভের ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উদ্যোগের একটি যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। জমির মূল্য বৃদ্ধির ফলে যে আর্থিক সুবিধা সৃষ্টি হয়, তা মূলধনী লাভ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের লাভের ওপর কর আরোপ করা হয়। সরকারের লক্ষ্য করের আওতা সম্প্রসারণ, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সম্পদভিত্তিক আয়ের একটি অংশ রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা। তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। বর্তমানে আবাসন খাত উচ্চ নির্মাণ ব্যয়, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, অর্থায়নের উচ্চ খরচ এবং ক্রেতাদের সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে একটি চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। রড, সিমেন্ট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লিফট, জেনারেটরসহ প্রায় সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর মূল্য গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে জমির মালিকদের ওপর নতুন কর আরোপের ফলে অনেক জমির মালিক যৌথ উন্নয়ন চুক্তিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। কারণ অতিরিক্ত করের বোঝা বিবেচনায় তারা আরও বেশি ফ্ল্যাট বা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারেন। এর ফলে প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের একটি অংশ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপর বর্তাবে। অর্থাৎ আবাসনের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে পুরোনো জমির মালিকদের ওপর। কারণ ২০ বা ৩০ বছর আগে যে জমিগুলো তুলনামূলক কম মূল্যে ক্রয় করা হয়েছিল, সেগুলোর বর্তমান মূল্য অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জমির মূল ক্রয়মূল্য এবং বর্তমান সম্পদমূল্যের মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি হওয়ায় করযোগ্য লাভের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হবে।
একটি বাস্তব উদাহরণ
ধরা যাক, একজন জমির মালিক ২০০০ সালে ঢাকার একটি এলাকায় ১০ কাঠা জমি ৫০ লাখ টাকায় ক্রয় করেছিলেন। জমি ক্রয়ের সময় তিনি রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, নিবন্ধন কর এবং অন্যান্য সরকারি চার্জ পরিশোধ করেছিলেন। অর্থাৎ সম্পদটি অধিগ্রহণের সময় তিনি তার প্রযোজ্য কর ও ফি পরিশোধ করেছিলেন। বর্তমানে তিনি একজন ডেভেলপারের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন চুক্তিতে অংশগ্রহণ করলেন এবং প্রকল্প শেষে ১০টি ফ্ল্যাট পেলেন। যদি সরকারি নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৫০ লাখ টাকা ধরা হয়, তাহলে তার প্রাপ্ত সম্পদের মোট মূল্য দাঁড়াবে ৫ কোটি টাকা।
১০টি ফ্ল্যাট × ৫০ লাখ টাকা = ৫ কোটি টাকা
এখন জমির মূল ক্রয়মূল্য ৫০ লাখ টাকা বাদ দিলে করযোগ্য মূলধনী লাভ হবে:
৫ কোটি টাকা – ৫০ লাখ টাকা = ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা
এই লাভের ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স আরোপ করা হলে করের পরিমাণ হবে:
৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা × ১৫% = ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা
অর্থাৎ, জমির মালিককে প্রায় ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা কর পরিশোধ করতে হতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। জমির মালিক প্রকৃতপক্ষে কোনো নগদ অর্থ গ্রহণ করছেন না; বরং একটি সম্পদের বিনিময়ে আরেকটি সম্পদ গ্রহণ করছেন। ফলে আবাসন খাতের অনেক অংশীজনের মতে, ফ্ল্যাট বিক্রির আগেই কর আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। তাদের মতে, প্রকৃত অর্থে নগদ লাভ অর্জনের পর কর আরোপ করলে তা বাস্তবতার সঙ্গে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
একই সঙ্গে এই অতিরিক্ত করের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ওপরও পড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি মাঝারি আকারের প্রকল্পে যদি অতিরিক্ত কর ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় হিসেবে ৭০ লাখ টাকা যোগ হয় এবং প্রকল্পে ২০,০০০ বর্গফুট বিক্রয়যোগ্য এলাকা থাকে, তাহলে প্রতি বর্গফুটে প্রায় ৩৫০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হবে। একটি ১,৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে এর প্রভাব দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) ইতোমধ্যে এই প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এই কর কার্যকর হলে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা কমে যেতে পারে, জমির মালিক ও ডেভেলপারদের মধ্যে সমঝোতা জটিল হতে পারে এবং আবাসন খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে আবাসন খাত কেবল একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; এটি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, নগরায়ণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শত শত মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে এই খাতের ওপর যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব বহুমাত্রিক। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আহরণের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব প্রয়োজন। তাই কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং করের আওতা সম্প্রসারণ একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।
তবে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আহরণ এবং আবাসন খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। যদি কর আরোপ করতেই হয়, তাহলে বাস্তব বাজার পরিস্থিতি, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমির বিষয়, কর অব্যাহতির সীমা অথবা ফ্ল্যাট বিক্রির সময় কর আদায়ের মতো বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী দুই দশকে শহরমুখী জনসংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং আবাসনের চাহিদাও বহুগুণ বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে আবাসন খাতকে নিরুৎসাহিত না করে বরং পরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলা যায়, জমির মালিকদের ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব শুধু একটি কর নীতি নয়; এটি বাংলাদেশের আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সরকার, আবাসন উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ এবং জমির মালিকদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।
তাবাস্সুম ইমাম
ভাইস প্রেসিডেন্ট
রিয়েল এস্টেট প্রফেশনালস ফোরাম











