৩০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বাতিল: বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রিয়েল এস্টেট খাতে কী প্রভাব পড়তে পারে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহু বছর ধরেই অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছিল। অবশেষে ফাইন্যান্স বিল ২০২৬-এ সরকার এই সুবিধা বাতিল করেছে। একই সঙ্গে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি এবং শিক্ষা ও ডিজিটাল খাতে কর ও ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রিয়েল এস্টেট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (GDP) রিয়েল এস্টেট খাতের অবদান ছিল প্রায় ৭.৯৩ শতাংশ। অন্যদিকে, রিয়েল এস্টেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্মাণসামগ্রী, স্টিল, সিমেন্ট, সিরামিক, গ্লাস, বৈদ্যুতিক পণ্য, পরিবহনসহ বিভিন্ন সহায়ক শিল্প যুক্ত করলে এই অবদান ১২–১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায় বলে জানিয়েছে REHAB।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮৯৪টি REHAB সদস্য প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। প্রতিবছর এসব প্রতিষ্ঠান ৯,০০০–১০,০০০টি অ্যাপার্টমেন্ট এবং ৫,০০০–৬,০০০টি প্লট হস্তান্তর করে। খাতটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, অপ্রদর্শিত অর্থের একটি অংশ জমি ও ফ্ল্যাট কেনার মাধ্যমে রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ করা হতো। এর ফলে অনেক সময় প্রকৃত চাহিদার তুলনায় সম্পদের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেত এবং মধ্যবিত্ত ও প্রথমবারের ক্রেতাদের জন্য বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ত।

সম্ভাব্য প্রভাব

স্বল্পমেয়াদে উচ্চমূল্যের জমি ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজারে কিছুটা ধীরগতি দেখা যেতে পারে। যেসব বিনিয়োগকারী অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহার করতেন, তারা এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে পারেন। এর ফলে কিছু প্রকল্পের বিক্রয় গতি কমতে পারে এবং বাজারে নগদ লেনদেনও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সিদ্ধান্ত রিয়েল এস্টেট খাতকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিক করে তুলতে পারে। বৈধ আয়ের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ বাড়লে ব্যাংক ঋণ, হোম লোন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ক্রেতারা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।

রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোকেও এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। শুধুমাত্র নগদনির্ভর বিক্রয়ের পরিবর্তে ব্যাংক ফাইন্যান্সিং, সহজ কিস্তি, মধ্যবিত্তবান্ধব প্রকল্প এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এতে খাতটি আরও টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক পরিবেশের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বন্ধ করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। এর পাশাপাশি অর্থপাচার রোধ, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং বৈধ বিনিয়োগের জন্য সহজ অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই রিয়েল এস্টেট খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং আবাসন উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

তাবাসসুম ইমাম, 

ভাইস প্রেসিডেন্ট,

রিয়েল এস্টেট প্রফেশনালস ফোরাম

 

সম্পর্কিত খবর

সর্বাধিক পঠিত

রেজিস্ট্রেশন ব্যয় কমানো ও স্বল্পসুদে ঋণের দাবি, আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াতে চায় নীতিগত সহায়তা

রেজিস্ট্রেশন ব্যয় কমানো ও স্বল্পসুদে ঋণের দাবি, আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াতে চায় নীতিগত সহায়তা

দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনতে আবাসন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার...

অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগকে স্বাগত জানাল রিহ্যাব, নির্মাণসামগ্রীর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহারের দাবি

অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগকে স্বাগত জানাল রিহ্যাব, নির্মাণসামগ্রীর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহারের দাবি

প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের...