২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাড়ি নির্মাণের নিয়ম-কানুন: কতটুকু জায়গা ছাড়বেন, কত তলা করতে পারবেন

বাড়ি নির্মাণের সময় জমির পাশাপাশি আইনগত বৈধতা ও কারিগরি নির্দেশনা মেনে চলা নিরাপদ ও টেকসই স্থাপনা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত। বাড়ি করার সময় কতটুকু জায়গা ফাঁকা রাখতে হয়, অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ করলে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আইন কী বলছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান

জমির কাগজপত্র যাচাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, বাড়ি নির্মাণের আগে জমির আইনগত অবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, খাজনা পরিশোধের দাখিলাসহ প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে।

এরপর ভবনের নকশা অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, একজন অনুমোদিত স্থপতি বা প্রকৌশলীর মাধ্যমে নকশা প্রণয়ন করলে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি-২০২০) অনুযায়ী নিরাপত্তা, আলো-বাতাস, অগ্নি প্রতিরোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ভূমিকম্প সহনশীলতার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ড্রেনেজ ও সেপটিক ট্যাংকের পরিকল্পনাও আগে থেকেই নির্ধারণ করা উচিত।

গ্রাম ও শহরে কি একই নিয়ম?

শহর ও গ্রামাঞ্চলে ভবন নির্মাণের নিয়ম পুরোপুরি এক নয়। রাজধানী ঢাকায় রাজউক, চট্টগ্রামে সিডিএ, রাজশাহীতে আরডিএ এবং অন্যান্য শহরে পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করতে হয়। এসব এলাকায় নির্দিষ্ট সেটব্যাক, খোলা জায়গা, ভবনের উচ্চতা, রাস্তা থেকে দূরত্ব এবং নিরাপত্তা বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি প্রয়োজন হয়। তবে সেখানেও প্রতিবেশীর জমিতে অনধিকার প্রবেশ না করা, ন্যূনতম খোলা জায়গা রাখা এবং সঠিক পানি ও নিকাশ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা জরুরি। শহরাঞ্চলে নিয়ম ভঙ্গ করলে জরিমানা কিংবা ভবন অপসারণের মতো শাস্তির বিধান রয়েছে।

বাড়ি নির্মাণে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে?

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি-২০২০) অনুযায়ী ভবন নির্মাণের সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা বা ‘সেটব্যাক’ রাখা বাধ্যতামূলক।

সাধারণভাবে—

  • সামনের দিকে ৫ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত জায়গা ফাঁকা রাখতে হয়।
  • পেছনের দিকে ৪ থেকে ৬ ফুট জায়গা রাখতে হয়।
  • দুই পাশে ৩ থেকে ৫ ফুট খোলা জায়গা রাখতে হয়।

বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব আরও বেশি হতে পারে। এছাড়া মোট জমির অন্তত ৩০ শতাংশ খোলা রাখা প্রয়োজন, যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

জায়গা না ছাড়লে কী হতে পারে?

আইন অনুযায়ী নির্ধারিত জায়গা না রেখে কিংবা অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ করলে সেটি অবৈধ নির্মাণ হিসেবে গণ্য হয়। এ ক্ষেত্রে রাজউক, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে দিতে পারে। এছাড়া জরিমানা, মামলা কিংবা বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।

যদি কোনো নির্মাণের কারণে প্রতিবেশীর আলো-বাতাস বা জমির অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আদালতে মামলা করতে পারেন। তাছাড়া অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের সময় পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকলে উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

অনুমোদন ছাড়া নির্মিত ভবন কি পরে বৈধ করা যায়?

কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা দিয়ে এবং সংশোধিত নকশা জমা দিয়ে ভবন বৈধ করার সুযোগ থাকে। তবে এটি সীমিত পরিসরে প্রযোজ্য। যদি ভবনটি সরকারি জমি, রাস্তার ওপর বা নির্ধারিত সেটব্যাক অমান্য করে নির্মিত হয়, তাহলে সেটি সাধারণত বৈধ করা যায় না; বরং অপসারণের ঝুঁকিতে পড়ে।

ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ হয় কীভাবে?

বিএনবিসি অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা নির্ভর করে এলাকার ধরন, রাস্তার প্রস্থ এবং জমির আকারের ওপর।

  • সরু রাস্তার পাশে সাধারণত চারতলার বেশি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয় না।
  • বড় সড়ক বা বাণিজ্যিক এলাকায় ১০ তলা বা তার বেশি উচ্চতার ভবনের অনুমতি পাওয়া যেতে পারে।
  • তবে চূড়ান্তভাবে তলার সংখ্যা নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) অনুযায়ী।

পানি ও নিকাশ ব্যবস্থার বাধ্যবাধকতা

শহরাঞ্চলের প্রতিটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি ওয়াসা বা পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করতে হয়। এসব শর্ত পূরণ না করলে ভবনের অনুমোদন বাতিল বা জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।

নির্মাণকাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি

ভবন নির্মাণের সময় শ্রমিকদের জন্য সেফটি হেলমেট, নিরাপত্তা জুতা ও বেল্ট ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ফায়ার এক্সিট এবং জরুরি সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় এবং রাস্তা অবরুদ্ধ না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা, সবুজায়ন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং) এবং সৌরবিদ্যুৎ (সোলার সিস্টেম) ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ভবনকে পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব। বর্তমানে বিএনবিসি ও পরিবেশ অধিদপ্তর টেকসই ও পরিবেশসম্মত ভবন নির্মাণকে উৎসাহিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্পর্কিত খবর

সর্বাধিক পঠিত

অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগকে স্বাগত জানাল রিহ্যাব, নির্মাণসামগ্রীর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহারের দাবি

অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগকে স্বাগত জানাল রিহ্যাব, নির্মাণসামগ্রীর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহারের দাবি

প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের...