মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেট বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে দুবাইকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই ধারণায় কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রিয়েল এস্টেট লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মার্চের প্রথম ১২ দিনে ইউএইতে রিয়েল এস্টেট লেনদেন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ শতাংশ এবং আগের মাসের তুলনায় ৪৯ শতাংশ কমেছিল। কিছু সম্পত্তিতে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ের কথাও তখন জানা যায়।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুবাইয়ের সম্পত্তি বাজারে বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের তথ্য ইতোমধ্যে সামনে এসেছে।
C4ADS-এর দুবাইয়ের ভূমি রেকর্ডভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, ৪৬১ বাংলাদেশির নামে দুবাইয়ে ৯২৯টি সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে। পত্রিকাটির হিসাব অনুযায়ী, এসব সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে তথ্যগুলো মূলত ২০২০ ও ২০২২ সালের রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই বর্তমান মালিকানা বা মূল্য ভিন্ন হতে পারে।
সব বাংলাদেশির বিদেশি সম্পত্তিকে অবশ্যই কালো টাকা বলা যাবে না। বৈধভাবে বিদেশে বিনিয়োগ করা অর্থও রয়েছে। তবে দুবাইয়ে অর্থপাচারের মাধ্যমে সম্পত্তি কেনার অভিযোগে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনও তদন্ত করছে। দুবাইয়ের গোল্ডেন ভিসার আওতায় সম্পদ কেনা কয়েক ডজন বাংলাদেশির কর-তথ্য চাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিদেশে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমলে এই অর্থের একটি অংশ কি বাংলাদেশে ফিরতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হতে পারে। যারা বিদেশে নতুন সম্পত্তি কেনার কথা ভাবছিলেন, তারা দেশের বাজার নতুন করে বিবেচনা করতে পারেন। আর বিদেশে থাকা বৈধ ও ঘোষণাযোগ্য অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার উপযুক্ত নীতি তৈরি করতে পারে।
এক্ষেত্রে রিয়েল এস্টেট হতে পারে অন্যতম ভালো বিনিয়োগ ক্ষেত্র। কারণ এই খাতের সঙ্গে শুধু ফ্ল্যাট বা জমি কেনাবেচা জড়িত নয়। সিমেন্ট, রড, সিরামিক, আসবাব, ইন্টেরিয়র, স্থাপত্য, প্রকৌশল, ব্যাংকিংসহ বহু খাত এর সঙ্গে যুক্ত। REHAB-এর হিসাবে রিয়েল এস্টেট প্রায় ২৬৯টি শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাথমিক হিসাবে শুধু রিয়েল এস্টেট কার্যক্রমের অর্থনৈতিক অবদান প্রায় ৪.৮ লাখ কোটি টাকা।
অর্থাৎ একজন বাংলাদেশি দুবাইয়ে সম্পত্তি কিনলে সেই অর্থ মূলত দুবাইয়ের অর্থনীতিতে কাজ করে। একই অর্থ বাংলাদেশে অ্যাপার্টমেন্ট, জমি, বাণিজ্যিক ভবন, হোটেল, রিসোর্ট কিংবা অন্য কোনো রিয়েল এস্টেট প্রকল্পে বিনিয়োগ হলে সেই অর্থ দেশের ভেতরেই ঘুরবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়াবে।
তবে কালো টাকা বা অপরাধলব্ধ অর্থকে সরাসরি বৈধ করার সুযোগ দেওয়া সমাধান নয়। বরং বিদেশে থাকা বৈধ অর্থ দেশে ফেরানো এবং ঘোষণাযোগ্য অপ্রদর্শিত অর্থকে আইন, কর ও অর্থের উৎস যাচাইয়ের মাধ্যমে মূলধারার অর্থনীতিতে আনার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
যুদ্ধ দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেট বাজারকে কতটা দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশের উচিত এই সময়টিকে সুযোগ হিসেবে দেখা।
দেশের রিয়েল এস্টেট বাজার যদি আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব করা যায়, তাহলে বিদেশমুখী বাংলাদেশি মূলধনের একটি অংশ দেশেই ধরে রাখা সম্ভব। আর দুবাইসহ বিদেশে থাকা বৈধ ও ঘোষণাযোগ্য বাংলাদেশি অর্থের একটি অংশ দেশে ফিরে রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ হলে সেটি শুধু আবাসন খাত নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সুযোগ হতে পারে।
তাবাসসুম ইমাম
ভাইস প্রেসিডেন্ট
রিয়েল এস্টেট প্রফেশনালস ফোরাম
সিইও – নেক্স রিয়েল এস্টেট











