তাবাসসুম ইমাম
সিইও — নেক্স রিয়েল এস্টেট
ভাইস প্রেসিডেন্ট — রিয়েল এস্টেট প্রফেশনাল ফোরাম
বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত গত কয়েক দশকে অনেক বড় হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক ভবন, জমি এবং বিভিন্ন ধরনের আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন প্রপার্টির বাজারের পাশাপাশি আরেকটি বড় বাজার ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে, যেটিকে আমরা সেকেন্ডারি প্রপার্টি মার্কেট বা পুনঃবিক্রয়যোগ্য সম্পত্তির বাজার বলি।
সহজভাবে বলতে গেলে, একজন ব্যক্তি আগে কিনেছেন এমন ফ্ল্যাট, জমি, অফিস বা বাণিজ্যিক স্পেস যখন আবার বিক্রি করেন, তখন সেটি সেকেন্ডারি প্রপার্টি মার্কেটের অংশ হয়ে যায়। বিশ্বের অনেক দেশে এই বাজার রিয়েল এস্টেট ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশেও এর চাহিদা বাড়ছে। তবে এখনো এই বাজার পুরোপুরি সংগঠিত হয়নি।
ঢাকা শহরের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, বসুন্ধরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন অসংখ্য ফ্ল্যাট, জমি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি পুনরায় বিক্রির জন্য বাজারে আসে। অনেক মালিক পারিবারিক প্রয়োজন, নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক প্রয়োজন অথবা অন্য এলাকায় স্থানান্তরের কারণে সম্পত্তি বিক্রি করতে চান। অন্যদিকে অনেক ক্রেতা নতুন ফ্ল্যাটের পরিবর্তে তৈরি ও ব্যবহারযোগ্য পুরোনো ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী।
সেকেন্ডারি মার্কেটের একটি বড় সুবিধা হলো, ক্রেতা সাধারণত সম্পত্তিটি সরাসরি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ভবনটি কেমন, এলাকার পরিবেশ কেমন, যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন, আশপাশে স্কুল, হাসপাতাল, বাজার বা অন্যান্য সুবিধা আছে কি না—এসব বাস্তবে যাচাই করা যায়। নির্মাণাধীন প্রকল্পে অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু তৈরি সম্পত্তির ক্ষেত্রে ক্রেতার সামনে বাস্তব চিত্র থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে সেকেন্ডারি মার্কেটে তুলনামূলক ভালো দামে সম্পত্তি পাওয়ার সুযোগও থাকে। একজন মালিকের দ্রুত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, কেউ দেশের বাইরে চলে যেতে পারেন, আবার কেউ পুরোনো সম্পত্তি বিক্রি করে নতুন সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে একজন ক্রেতা ভালো লোকেশনে যুক্তিসংগত দামে সম্পত্তি কেনার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে বাংলাদেশের এই বাজারে কিছু বড় সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো সঠিক তথ্যের অভাব। একজন মালিক তার সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে কোথায় গেলে প্রকৃত ক্রেতা পাবেন, তা অনেক সময় জানেন না। একইভাবে একজন ক্রেতাও জানেন না তার প্রয়োজন ও বাজেট অনুযায়ী কোন এলাকায় কোন সম্পত্তি বিক্রির জন্য রয়েছে।
অনেক সময় একই সম্পত্তির তথ্য একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ভিন্নভাবে পাওয়া যায়। কোথাও মূল্য এক রকম, আবার কোথাও অন্য রকম। সম্পত্তির আয়তন, মালিকানা, কাগজপত্র কিংবা অন্যান্য তথ্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাস। রিয়েল এস্টেট সাধারণ কোনো পণ্য নয়। একটি ফ্ল্যাট বা জমি কিনতে একজন মানুষকে তার জীবনের বড় একটি সঞ্চয় বিনিয়োগ করতে হতে পারে। তাই এখানে সঠিক তথ্য এবং নিরাপদ লেনদেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সম্পত্তি কেনার আগে মালিকানা, দলিল, নামজারি, খাজনা, অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি। ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ভবনের অনুমোদন, জমির মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও দেখা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক সাধারণ ক্রেতার পক্ষে এসব বিষয় নিজে যাচাই করা কঠিন।
এখানেই পেশাদার রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ও অভিজ্ঞ প্রপার্টি কনসালট্যান্টদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একজন পেশাদারের কাজ শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া নয়। তার দায়িত্ব হওয়া উচিত সঠিক তথ্য দেওয়া, সম্পত্তির প্রাথমিক যাচাই করা, বাজারমূল্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং পুরো লেনদেনকে যতটা সম্ভব স্বচ্ছ ও সহজ করা।
বাংলাদেশে সেকেন্ডারি প্রপার্টি মার্কেটকে আরও শক্তিশালী করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। একটি বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যাচাইকৃত সম্পত্তির তথ্য, ছবি, ভিডিও, লোকেশন, আয়তন, মূল্য এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সহজভাবে পাওয়া গেলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে।
একই সঙ্গে সম্পত্তির সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মালিক আবেগ বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করেন। আবার ক্রেতাও প্রকৃত বাজারমূল্য না জানার কারণে অস্বাভাবিক কম মূল্য প্রস্তাব করতে পারেন। এলাকার অবস্থান, সাম্প্রতিক লেনদেন, ভবনের বয়স, রাস্তার সুবিধা, নির্মাণের মান এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই বাজারের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেকেন্ডারি ফ্ল্যাট কেনার জন্য সহজ ও কার্যকর হোম লোন সুবিধা আরও বিস্তৃত হলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ভালো লোকেশনে নিজের বাসস্থান কেনার সুযোগ বাড়বে।
একটি ভবন পুরোনো হলেই তার মূল্য শেষ হয়ে যায় না। ভালো লোকেশন, ভালো নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকলে একটি ব্যবহৃত ফ্ল্যাটও দীর্ঘ সময় ভালো মূল্য ধরে রাখতে পারে। বিশেষ করে ঢাকার প্রতিষ্ঠিত এলাকাগুলোতে জমির মূল্য বেশি হওয়ায় পুরোনো সম্পত্তিরও উল্লেখযোগ্য বাজারমূল্য থাকতে পারে।
সেকেন্ডারি মার্কেট শক্তিশালী হলে শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতা নয়, পুরো রিয়েল এস্টেট খাত উপকৃত হবে। একজন সম্পত্তির মালিক সহজে তার সম্পদ বিক্রি করতে পারলে তার বিনিয়োগের অর্থ আবার নতুন ফ্ল্যাট, জমি বা অন্য কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারেন। এর মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ তৈরি হয় এবং অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট বাজার এখন পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রয়েছে। শুধু নতুন ভবন নির্মাণ ও বিক্রির মধ্যেই এই খাতের ভবিষ্যৎ সীমাবদ্ধ নয়। ইতোমধ্যে তৈরি হওয়া বিপুলসংখ্যক ফ্ল্যাট, জমি, অফিস ও বাণিজ্যিক সম্পত্তিকে একটি সংগঠিত পুনঃবিক্রয় ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসার বড় সুযোগ রয়েছে।
এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি, পেশাদার সেবা, সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে বিশ্বাস।
বাংলাদেশে সেকেন্ডারি প্রপার্টি মার্কেট এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছায়নি। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি দেশের রিয়েল এস্টেট খাতের অন্যতম বড় বাজারে পরিণত হতে পারে।
আগামী দিনের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুধু নতুন সম্পত্তি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরোনো ও বিদ্যমান সম্পত্তিকে সঠিক ক্রেতার কাছে, সঠিক মূল্যে এবং নিরাপদ প্রক্রিয়ায় পৌঁছে দেওয়াও হবে এই খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর এখানেই বাংলাদেশের সেকেন্ডারি প্রপার্টি মার্কেটের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।











