বাংলাদেশের আবাসন খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। একদিকে শহরাঞ্চলে আবাসনের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, অন্যদিকে জমির মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর দাম এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য একটি ফ্ল্যাট কেনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় একটি মানসম্মত ফ্ল্যাটের দাম অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
গত তিন বছরে দেশের আবাসন বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ১৭ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাটের দাম গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। আগে যে মধ্যম আকারের একটি ফ্ল্যাট ৮০ থেকে ৮৫ লাখ টাকায় কেনা যেত, সেটির মূল্য অনেক ক্ষেত্রে ১ কোটিরও বেশি হয়ে যায়।
২০২৪ সালে বাজারে আরও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে ঢাকায় ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রি প্রায় ২৭ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে যে ফ্ল্যাট বুকিং ও বিক্রয় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে—আবাসনের চাহিদা কমেনি, বরং ক্রেতারা এখন তুলনামূলক কম খরচে এবং বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজছেন। প্রতি বছর নতুন পরিবার গঠন, নগরায়ন এবং কর্মসংস্থানের কারণে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় আবাসনের চাহিদা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু প্রচলিত ডেভেলপার মডেলে ফ্ল্যাটের উচ্চ মূল্য অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারকে বাজারের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় ল্যান্ড শেয়ার ভিত্তিক ফ্ল্যাট ক্রয় মডেল একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে। এই মডেলে একজন ক্রেতা শুধু একটি ফ্ল্যাটের ক্রেতা নন, বরং তিনি প্রকল্পের জমিরও অংশীদার হন। জমির মালিকানা এবং নির্মাণ ব্যয় আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয় বলে প্রকল্পের মোট ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হয়। ফলে প্রচলিত ডেভেলপার মডেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।
ল্যান্ড শেয়ার মডেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বচ্ছতা। এখানে ক্রেতারা জানতে পারেন জমির জন্য কত টাকা ব্যয় হচ্ছে এবং নির্মাণের জন্য কত টাকা ব্যয় হচ্ছে। ফলে প্রকৃত খরচ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে জমির মূল্য বৃদ্ধি পেলে সেই সুবিধাও সরাসরি অংশীদাররা লাভ করতে পারেন।
বর্তমানে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবার এমন একটি সমাধান খুঁজছে যেখানে সীমিত বাজেটে ভালো লোকেশনে নিজস্ব ফ্ল্যাটের মালিক হওয়া সম্ভব। ল্যান্ড শেয়ার ভিত্তিক মডেল সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নতুন উন্নয়নশীল এলাকাগুলোতে এই মডেলের মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও মালিকানা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তবে এই মডেলের সফলতা নিশ্চিত করতে হলে সুশাসন, শক্তিশালী আইনি কাঠামো, স্বচ্ছ হিসাব ব্যবস্থা এবং পেশাদার প্রকল্প ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে অংশীদারদের আস্থা ও সমন্বয় বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় যেকোনো আবাসন প্রকল্পের মতো এখানেও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের আবাসন খাতে বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করলে বলা যায়, মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন নিশ্চিত করতে নতুন চিন্তা ও নতুন মডেলের প্রয়োজন রয়েছে। ল্যান্ড শেয়ার ভিত্তিক ফ্ল্যাট মডেল সেই সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোর একটি, যা ভবিষ্যতে আবাসন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
—
Architect Md. Abdur Rahman Nipu
Managing Director, Nex Real Estate











