বাংলাদেশের আবাসন শিল্প বর্তমানে গত এক দশকের অন্যতম কঠিন সময় অতিক্রম করছে। নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে দেশের আবাসন বাজার দীর্ঘমেয়াদি মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!বর্তমানে রড, সিমেন্ট, গ্লাস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লিফটসহ অধিকাংশ নির্মাণসামগ্রীর দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক ডেভেলপার পূর্বনির্ধারিত বাজেট ও মূল্য ধরে প্রকল্প সম্পন্ন করতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্প শুরু না করে অপেক্ষার নীতি অনুসরণ করছে।
অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আবাসন খাতে বিনিয়োগ বা নিজস্ব বাসস্থান কেনার সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং কঠোর ঋণনীতির কারণে সম্ভাব্য ক্রেতাদের একটি বড় অংশ সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখছেন। এতে বাজারে চাহিদা কমছে এবং ক্রেতাদের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি মূল্য এবং পরিবহন ব্যয়কে প্রভাবিত করছে। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের নির্মাণ খাতেও পড়ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশীয় ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অপেক্ষা ও সতর্কতার মনোভাব সৃষ্টি করছে, যা আবাসন বাজারকে আরও ধীর করে দিচ্ছে।
আবাসন শিল্প শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; এটি দেশের ২৬৯টিরও বেশি শিল্প ও সেবা খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, ফার্নিচার, পরিবহন, ব্যাংকিং, বীমা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, ইন্টেরিয়র ডিজাইন এবং লাখো দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং নতুন বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বর্তমান বাস্তবতায় আবাসন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের নীতিগত সহায়তা, যৌক্তিক সুদের হারে দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং ফাইন্যান্স, নির্মাণসামগ্রীর বাজারে কার্যকর নজরদারি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। আবাসন খাতকে সচল রাখা মানে শুধু একটি শিল্পকে বাঁচানো নয়; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং টেকসই নগর উন্নয়নের ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।
তাবাসসুম ইমাম
ডিরেক্টর ও সিইও,
নেক্স রিয়েল এস্টেট
ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিয়েল এস্টেট প্রফেশনালস ফোরাম











